পাহাড়ের ওপারে কিছু মানুষ
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর মধ্যে একটি হলো মানুষের আন্তরিকতা। এর কোনো দাম নেই, কোনো বাজার নেই, কোনো মুদ্রা নেই। অথচ এই জিনিসটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী।
মায়ানমারের শান স্টেটের পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে এই সত্যিটা আবার নতুন করে বুঝলাম।
সেদিন আমি লোকাল ট্রান্সপোর্টে করে পাহাড়ি গ্রামের দিকে যাচ্ছিলাম। গাড়িটা ছিল ছোট্ট, কিন্তু মানুষের হৃদয়গুলো ছিল বিশাল। চারপাশে সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা রাস্তা, আর মাঝে মাঝে কুয়াশার দল এসে রাস্তার বুক ঢেকে দিচ্ছিল।
আমি এক কোণে বসেছিলাম। একজন বিদেশি মানুষকে দেখে গাড়ির সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠলো।
— “তোমার নাম কী?”
— “কোথা থেকে এসেছো?”
— “তুমি কি কাজ করো?”
প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
আমি বললাম, “বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমি একজন ট্রাভেল ভ্লগার।”
বাংলাদেশের নাম শুনে তাদের চোখে যেন আরও আলো জ্বলে উঠলো।
মানুষ আসলে গল্প ভালোবাসে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষই গল্প ভালোবাসে। আর ভ্রমণকারীরা হলো হাঁটতে থাকা গল্প।
গাড়ির ভেতরে বসা পরিবারটি কিছুক্ষণ পর বললো,
— “আমাদের বাসায় চলুন।”
আমি হেসে বললাম,
— “না, কষ্ট হবে।”
তারা আবার বললো,
— “প্লিজ আসুন। আপনি গেলে আমরা খুব খুশি হবো।”
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে কিছু কিছু অনুরোধ থাকে যা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। কারণ সেখানে ভাষা থাকে না, থাকে হৃদয়ের ডাক।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।
পাহাড়ের কোলে তাদের ছোট্ট বাড়িটিতে পৌঁছানোর পর যা ঘটলো, তা আমার কল্পনারও বাইরে।
মনে হলো যেন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো আত্মীয় ফিরে এসেছে।
একজন চা নিয়ে আসলো।
আরেকজন শরবত।
কিছুক্ষণ পর আম কেটে দিল।
তারপর ফল।
তারপর কফি।
তারপর বিস্কুট।
তারপর আবার ফল।
আমি বারবার বলছি,
— “আর লাগবে না।”
কিন্তু অতিথিপরায়ণ মানুষের অভিধানে “আর লাগবে না” কথাটার কোনো অর্থ নেই।
তারা শুধু হাসছিল।
যে হাসির মধ্যে কোনো স্বার্থ ছিল না।
কোনো ব্যবসা ছিল না।
কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
শুধু ভালোবাসা ছিল।
ধীরে ধীরে আশেপাশের মানুষজনও আসতে শুরু করলো।
শিশুরা দূর থেকে উঁকি মারছে।
বয়স্করা বসে গল্প শুনছে।
কেউ ছবি তুলতে চায়।
কেউ জানতে চায় বাংলাদেশ কেমন।
মনে হচ্ছিল পুরো গ্রামটাই যেন আমাকে দেখতে এসেছে।
হয়তো কারণ, সেখানে পর্যটক খুব কম যায়।
গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া এখনো মায়ানমারের অনেক অঞ্চলের উপর ঝুলে আছে।
মানুষের চলাফেরা কমে গেছে।
বিদেশিদের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে।
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি শান স্টেটের একটি দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রামে।
ভাবতেই অবাক লাগে।
একজন সাধারণ রাজমিস্ত্রি থেকে আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ভ্লগার হয়ে ওঠা ছেলেটি, যে একদিন বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ হলে সংসারের চিন্তায় ঘুমাতে পারতো না, সেই ছেলেটি আজ পৃথিবীর আরেক প্রান্তের পাহাড়ি গ্রামে বসে অচেনা মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে।
জীবন সত্যিই অদ্ভুত।
কখন কোন রাস্তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, কেউ জানে না।
এই যাত্রা ছিল ৭২ ঘণ্টার এক ঐতিহাসিক পাহাড়ি অভিযান।
প্রায় ৭০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ।
কখনো কাদা।
কখনো খাড়া উঁচু রাস্তা।
কখনো জঙ্গলের ভেতর সরু পথ।
কখনো মেঘের মধ্যে হেঁটে যাওয়া।
কিন্তু সেই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পাহাড় নয়।
প্রাপ্তি ছিল মানুষ।
কারণ পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখে দেখা যায়।
মানুষের সৌন্দর্য অনুভব করতে হয়।
আমি বসে বসে ভাবছিলাম—
আত্মীয়তা আসলে কী?
রক্তের সম্পর্ক?
নাকি হৃদয়ের সম্পর্ক?
আমরা পৃথিবীতে যত মানুষকে আত্মীয় বলি, তাদের অনেকেই প্রয়োজনে পাশে থাকে না।
আবার অনেক অচেনা মানুষ আছে, যারা এক কাপ চা হাতে নিয়ে এমনভাবে পাশে বসে যে মনে হয় বহু জন্মের পরিচয়।
হয়তো মানুষ পৃথিবীতে এসেছে আত্মীয় খুঁজতে নয়।
মানুষ এসেছে আত্মীয় তৈরি করতে।
ভাষা আলাদা।
ধর্ম আলাদা।
দেশ আলাদা।
সংস্কৃতি আলাদা।
তবুও একটি মায়ানমারের পাহাড়ি পরিবারের মা যখন বলে,
— “আরেকটু ফল খান।”
তখন আমার নিজের মায়ের কথাই মনে পড়ে।
পৃথিবীর সব মায়ের ভাষা আলাদা হতে পারে।
কিন্তু মায়ের মমতা সব দেশে একই থাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।
বাড়ির বারান্দায় বসে আমি চুপচাপ চারপাশ দেখছিলাম।
মানুষগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ রান্না করছে।
কেউ শিশু কোলে নিয়ে হাঁটছে।
কেউ কাঠ কাটছে।
কেউ গল্প করছে।
আর আমি ভাবছিলাম—
এই পৃথিবী এখনো টিকে আছে রাজনীতি দিয়ে নয়।
যুদ্ধ দিয়ে নয়।
অর্থনীতি দিয়ে নয়।
এই পৃথিবী এখনো টিকে আছে কিছু সাধারণ মানুষের অসাধারণ হৃদয়ের উপর।
যারা একজন অচেনা পথিককে দেখে বলে—
“ভাই, আমাদের বাসায় আসুন।”
হয়তো কয়েক বছর পর আমি এই গ্রামের নাম ভুলে যাবো।
রাস্তার নাম ভুলে যাবো।
পাহাড়ের উচ্চতা ভুলে যাবো।
কিন্তু সেই চায়ের কাপ, সেই কাটা আম, সেই আন্তরিক হাসি, সেই মায়াভরা চোখ—
আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না।
কারণ পৃথিবীর মানচিত্রে দেশগুলোর সীমান্ত আছে।
কিন্তু ভালোবাসার কোনো সীমান্ত নেই।
আর সেই কারণেই, শান স্টেটের পাহাড়ি পথের এই দিনটি আমার ভ্রমণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
এই ঐতিহাসিক ৭২ ঘণ্টার, ৭০ কিলোমিটার পাহাড়ি অভিযানের পুরো গল্প খুব শীঘ্রই আমার ইউটিউব চ্যানেল “Ruhan Vlog”-এ দেখতে পাবেন।
হয়তো সেখানে পাহাড় দেখবেন, কুয়াশা দেখবেন, দুর্গম পথ দেখবেন। কিন্তু আমি চাই, আপনারা সবচেয়ে বেশি দেখুন মানুষের হৃদয়।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র কোনো পাহাড় নয়, কোনো সমুদ্র নয়—
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হলো একটি ভালো মানুষের হৃদয়। ❤️