জানালার কাঁচে আমার মুখটা ভাসিতেছিল। নিজের মুখ কি আর মানুষ সারাক্ষণ দেখে? কিন্তু চলন্ত গাড়িতে, যখন বাইরের পৃথিবী আর ভেতরের মুখ এক কাঁচে এসে ঠেকে, তখন মানুষ নিজেরে না দেখিয়া পারে না। আমি তখন মান্দালয় হইতে ইয়াঙ্গুনের দিকে যাইতেছিলাম। নীল সিটে কাত হইয়া, দুই হাত ভাঁজ কইরা, মাথা জানালার দিকে দিয়া, ভাবতেছিলাম—দেশ কাকে বলে?
গাড়ি ছুটিতেছিল। কিন্তু বাইরের মাঠগুলা ছুটিতেছিল না। ওদের মধ্যে একধরনের দেরি আছে। যেন তারা আজকের নয়, গতকালেরও নয়—আরো অনেক দিনের। সবুজ জমিনের উপর বাতাস এমন ভাবে গড়াইয়া যাইতেছিল, মনে হইতেছিল ধান না, বহুদিনের নিঃশ্বাস দুলতেছে। কোথাও সাদা গোরু মাথা নামাইয়া ঘাস খাইতেছে, কোথাও বা রাখাল লম্বা কাঠ ধইরা লাইনের ধারে দাড়াইয়া আছে, কোথাও তালগাছ একলা দাঁড়ায়া আছে আকাশের ভিতর। আর আমি, কাঁচের এপাশে বসা একজন পরদেশি মানুষ, মনে মনে আমার দেশের পুরান বইয়ের ভিতর ঢুইকা যাইতেছিলাম।
মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের বয়স তার শরীরের বয়স না। আমার বয়স অল্প, কিন্তু আমার ভিতরে অনেক বইপড়া সন্ধ্যা জমা আছে। কত যে উপন্যাস পড়ছি! কত গাঁও, কত নদী, কত খাল, কত চর, কত অনাহারী সংসার, কত বউ, কত রাখাল, কত গোরুর গাড়ি, কত ভাঙা উঠোন, কত দুঃখ, কত চুপ কইরা বাঁচা—সব যেন ভিতরে ভিতরে বসত গড়ছে। তাই এই মিয়ানমারের মাঠ দেখি, আর বাংলার পুরান দশক মনে পড়ে। মনে হয়, আমি অন্য দেশে নাই; আমি শুধু অন্য নামে ডাকা এক পুরোনো দেশের ভিতর দিয়া যাইতেছি।
এক জায়গায় দেখি, ধানক্ষেতের মাঝখানে ছোট্ট এক ছনের ঘর। ঘর না, ছায়া। তার পাশে একখান গাছ। দূর হইতে মনে হইল নারিকেল, কাছাকাছি আসিয়া বুঝলাম তেমন কিছু না, কিন্তু আমি ততক্ষণে ওইটারে নারিকেল গাছ ভাবিয়া ফেলেছি। কারণ চোখ শুধু দেখে না, সে মনে রাখে, বদলাইয়াও ফেলে। ঘরের সামনের মাটি রোদে শুকাইয়া সাদা হইয়া আছে। একপাশে ভাঙা হাঁড়ি, আরেক পাশে দুইটা কুকুর, আর দরজার গায়ে শুকনো পাতার রঙের কাপড়। মনে হইল, এখনই কোনো মাইয়া জলভরা কলসি নিয়া বাইরে আইব। কিন্তু কেউ আইল না। গাড়ি আগাইয়া গেল। জীবন অনেক দৃশ্য দেখায়, শেষ দৃশ্যটা দেখায় না।
গাড়ির কাঁচে আমার মুখের পাশে তালগাছের মাথা ভাসতে লাগল। সে তালগাছটা কেমন ছিল জানেন? এমন সোজা, এমন দাঁড়ানো, যেন বহুদিন ধইরা সে এই জমিনের পাহারা দিতেছে। তার নিচে ক্ষেত, ক্ষেতের গা ঘেঁষে চিকন জল, জলের ধারে ঝোপ, ঝোপের পেছনে আরো গাছ। আমি তাকাইয়া থাকতে থাকতে আচমকা জয়নুল আবেদিনের কথা মনে পড়ল। আঁকা তো সব সময় রঙের না; শুকনো রেখাও আঁকে। আর আমার মনে হইতেছিল, এই মাঠগুলা রঙে ভরা হইলেও এদের ভিতরে একধরনের শুকনো রেখা আছে। দারিদ্র্যের রেখা। অনামা মানুষের রেখা। যে-রেখা কাগজে আঁকা না থাকলেও পৃথিবীর গায়ে লেখা থাকে।
তখন আকাশ একেবারে নীল। নীলের ভিতর সাদা মেঘ। নিচে ধানের হলুদ-সবুজ। দূরে জল চিকচিক করতেছিল। এমন সুন্দর যে মানুষ কাঁদতে পারে। সৌন্দর্য কখনো কখনো দুঃখের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়। কারণ সে দেখায়—পৃথিবী এত সুন্দর হইতে পারে, তবু মানুষের জীবন এত কষ্টের কেন?
মাঠে যারা কাজ করতেছিল, তাদের আমি স্পষ্ট দেখি নাই। গাড়ি দ্রুত চলতেছিল। কিন্তু আমি জানতাম, তারা আছে। যে জমি এভাবে সবুজ, যে খালে এভাবে জল, যে গোরু এভাবে একা একা চরে, যে ঘরের সামনে মাটি এভাবে চাপা, সেখানে মানুষ না থাকলে হয় না। মানুষ থাকেই। মানুষ থাকে বলেই মাটি ভোরে জাগে, মানুষ থাকে বলেই গোধূলিতে ধোঁয়া উঠে, মানুষ থাকে বলেই কুকুর দুইটা দরজার কাছে বসে থাকে, মানুষ থাকে বলেই দূরের শিশুরা খালি গায়ে মাঠের আইল ধইরা দৌড়ায়।
এক জায়গায় সত্যি সত্যিই কিছু বাচ্চা দেখলাম। কইরা কী জানি খেলতেছিল। মাঠের ধার দিয়া দৌড়ায়, থামে, আবার দৌড়ায়। তাদের খেলায় কোনো মোবাইল নাই, কোনো স্ক্রিন নাই, কোনো লোহার শহর নাই। ওরা মাটির কাছে। এই জিনিসটারে আমরা উন্নয়ন কইরা ভুলে যাই। আবার এমনও না যে আমি দারিদ্র্যরে রোমান্টিক করি। না। বিদ্যুৎ নাই, নেটওয়ার্ক নাই, চিকিৎসা নাই, রাস্তা নাই—এই সব কষ্টও কষ্টই। কিন্তু এই কষ্টের ভিতরও মানুষ যে আকাশের নীচে নিঃশ্বাস নিতে পারে, গাছের ছায়া চিনে, বৃষ্টির শব্দে ঘুমায়, জমির মুখের দিকে তাকাইয়া দিন গোনে—এই সত্যও মিথ্যে না।
আমার দেশের কথা আরো বেশি মনে পড়তে লাগল। মনে পড়ল খালভরা পানি। মাঠভরা কুয়াল। কুয়ালভরা ধান। গরুর গাড়ির চাকা কাদায় বসে যাওয়া। ভোরবেলা ধানের পাতায় কুয়াশা। চৈত্রের গরমে শুকায়া যাওয়া পুকুরের কাদা। উঠোনের এক পাশে হাড়ি রোদে দিয়া রাখা। মাটির ঘর, তার পাশে একটা ডাবগাছ, আর পেছনে বাঁশঝাড়। এ রকম কত জীবন এই উপমহাদেশে হইয়া গেছে, কত আর হইতেছে! নাম আলাদা, ভাষা আলাদা, ধর্ম আলাদা, কিন্তু দরিদ্র কৃষকের ঘাম, খুপরি ঘরের ছায়া, বউদের নীরব কাজ, বাচ্চাদের ধুলাখেলা—এসবের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল।
আমি ভাবতেছিলাম, যদি এই জানালার বাইরের কোনো এক ঘরে এখন এক মাইয়া ভাত ধুইতেছে, সে কি জানে তার ঘরকে আমি বাংলা সাহিত্যের ভিতর দেখতেছি? সে কি জানে তার হাঁড়ির ধোঁয়া কোনো পরদেশি মানুষের মনে আরেক দেশের দুর্ভিক্ষ, আরেক দেশের শস্য, আরেক দেশের উপন্যাস জাগায়? জানে না। মানুষ নিজের জীবন লইয়া বাঁচে। অন্যের স্মৃতির ভিতর সে চরিত্র হইয়া যায় না। কিন্তু আমি জানতাম, সাহিত্য ঠিক এইখানেই জন্মায়। যেখানে একটা সাধারণ ঘর হঠাৎ এক সমগ্র যুগের প্রতীক হইয়া ওঠে।
গাড়ি থামল না, তবু আমি মনে মনে এক গ্রামে নামিয়া গেলাম।
সে গ্রামে একটা দীঘি আছে। দীঘির পাড়ে তালগাছ। ভোরে দুজন মাইয়া জল তুলতে আসে। একজনের নাম মাই থেই, আরেকজনের নাম রহিমা হইলেও অদ্ভুত কিছু না; এই অঞ্চলে নাম বদলায়, মানুষের পরিশ্রম বদলায় না। তাদের পায়ের গোড়ালি ফাটা। কিন্তু হাঁটায় লজ্জা নাই। বাড়িতে বুড়া শ্বশুর, জ্বরের বাচ্চা, আর ক্ষেতের দেনা। এক পুরুষ আছে, সে কখনো মাঠে, কখনো বাজারে, কখনো চুপ কইরা বিড়ি টানে। একটা ছেলে আছে, সে গোরুর পেছনে দৌড়ায়। একটা মেয়ে আছে, সে কাদা দিয়ে হাঁড়ি বানানোর ভান করে। সন্ধ্যায় ঘরে আগুন জ্বলে। ধোঁয়া উঠে। কুকুর ডাকে। দূরে কেউ বাঁশি বাজায় না, কারণ বাস্তবের গাঁয়ে সব সময় বাঁশি বাজে না; বরং হাঁড়িতে পানি ফোটার শব্দই সঙ্গীত।
বর্ষায় সেই গ্রাম অর্ধেক জলে ডুবে যায়। তখন আইল সরু হয়। হাঁটা কষ্ট হয়। কিন্তু ধান আরো সবুজ হয়। শীতে ভোরবেলা মানুষ মুড়ি খায়, লবণ মাখা পেঁয়াজ খায়, তারপর মাঠে যায়। গরমে দুপুর দগ্ধ হয়, কুকুরও ছায়া খোঁজে। আর মানুষের জীবন? সে চলে। অল্পে চলে। কষ্টে চলে। অপমানে চলে। ভালোবেসে চলে। সন্তান জন্ম দিয়ে চলে। সন্তান কবর দিয়ে চলে। আবার বীজ ফেলে। আবার ফসল কাটে। আবার ঋণ করে। আবার হাসে। এভাবেই তো বহু দেশ বহুদিন ধইরা বেঁচে আছে।
আমার মনে হইল, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা হইতেছে—সবকিছু নতুন। কিছুই তেমন নতুন না। নতুন ট্রেন আছে, নতুন মোবাইল আছে, নতুন মানচিত্র আছে। কিন্তু মানুষের ক্ষুধা পুরান, মাঠের বাতাস পুরান, টিনের অভাব পুরান, মাটির হাঁড়ি পুরান, বউদের গোপন কান্না পুরান, শিশুর খেলা পুরান, গরুর ধীর চোখ পুরান। আর সেইজন্যই জানালার এপাশে বসা আমি মনে করতেছিলাম—হাজার বছর না হোক, বহুদিন ধরেই মানুষ এইরকম এক উঠোন থেকে আরেক উঠোনে আসতেছে, ফসলের দিকে তাকাইয়া বাঁচতেছে, নদী-খাল-দীঘি আর কাঁচা মাটির ভিতর নিজের ভাগ্য খুঁজতেছে।
একটা সময় গাড়ি একটু বাঁক নিল। দূরের জলরেখা দেখা গেল। আকাশের নিচে তা চিকচিক করতেছিল। আমি জানালায় কপাল ঠেকালাম। ঠান্ডা লাগল। মনে হল, এই ঠান্ডাই বোধহয় মানুষের ভিতরের স্মৃতি। বাইরে যত দূরই যাই, সে হঠাৎ কাঁচে এসে লাগে।
তখনই আমি বুঝলাম, আমি আসলে মিয়ানমার দেখতেছি—এই কথাটা সত্যি। আবার আমি বাংলার সত্তরের দশক দেখতেছি—এই কথাটাও মিথ্যে না। মানুষ কখনো কেবল এক দেশ দেখে না। সে দেখে দেশ, তার সাথে পড়ে-থাকা বই, শুনে-আসা ইতিহাস, বংশগত কষ্ট, আর শিল্পের ভিতর জমে থাকা ছবি। তাই তালগাছ দেখলে আমার কেবল গাছ মনে হয় নাই; মনে হইছে দাঁড়ানো সময়। ছনের ঘর দেখে কেবল দারিদ্র্য মনে হয় নাই; মনে হইছে মানুষের হাড়ে-হাড়ে গড়া সহিষ্ণুতা। শিশুর খেলা দেখে কেবল অবসর মনে হয় নাই; মনে হইছে সভ্যতার প্রাচীনতম আনন্দ। আর সাদা গোরু দেখলে মনে হইছে, পৃথিবী এখনো পুরোপুরি লোহার না।
যখন ইয়াঙ্গুনের দিকের শহুরে ছাপ ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল, তখন আমি অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করলাম। যেন একটা পুরনো উপন্যাস বন্ধ হইয়া যাচ্ছে। অথচ উপন্যাস তো বন্ধ হয় না। আমি যেই মাঠ দেখলাম, সে মাঠে এখনো হাওয়া বইতেছে। যে ঘর পাশ কাটাইলাম, সে ঘরে এখনো কেউ চাল ধুইতেছে। যে কুকুর দেখলাম, সে এখনো উঠোনে শুইয়া আছে। যে শিশুগুলা দৌড়াইতেছিল, সন্ধ্যার আগে তারা ঘরে ফিরবে। কেউ ধমক দিবে। কেউ ভাত বাড়বে। কেউ আঙিনায় হাত-মুখ ধুইবে। তারপর রাত হবে। অন্ধকার নামবে। দূরে কোনো আলো নাই, তবু তারা আকাশের নিচে ঘুমাইয়া পড়বে।
আমি শহরে পৌঁছুম। তারা গ্রামে থাকবে।
তবু সেদিন মনে হইছিল, আমিও অল্প একটু তাদের সঙ্গেই থাকলাম। জানালার কাঁচের এক সরু সময়ের জন্য। সেই সময়টুকুই মানুষের সাহিত্য। সেইটুকুই স্মৃতি। সেইটুকুই দেশ।
আর তখন আমার মনে একটাই কথা আসতেছিল—পৃথিবীর কিছু গাঁও আছে, যারা কোনো এক দেশের না। তারা কেবল মানুষের। তারা বহুদিন ধরেই আছে। এখনও আছে। হয়তো আরও অনেক দিন থাকবে।